বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রশ্নের মুখে বিআইডব্লিউটিএর সক্ষমতা; নিরাপদ নৌযান সেবা ভেঙে পড়ায় ক্ষুব্ধ দ্বীপবাসী

৫ দিন ধরে অচল সী-ট্রাক, অবরুদ্ধ মহেশখালীর ৫ লাখ মানুষ

প্রকাশ: ৭ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:১৭

পড়া যাবে: [rt_reading_time] মিনিটে


নাছির উদ্দিন সোহেল, মহেশখালী;

মহেশখালী–কক্সবাজার নৌপথে চলাচলকারী একমাত্র সী-ট্রাকটি টানা পাঁচ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। রোগী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যেও সেবা স্বাভাবিক করতে না পারায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

দ্বীপবাসীর ভাষ্য, একসময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্পিডবোট ও কাঠের নৌকায় পারাপারই ছিল একমাত্র ভরসা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এ নৌপথে সী-ট্রাক চালু হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। নিরাপদ ও সাশ্রয়ী নৌযান হিসেবে সী-ট্রাকটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি, দীর্ঘ সময় সেবা বন্ধ থাকা এবং ধীরগতির মেরামত কার্যক্রম সেই স্বস্তিকে নতুন দুর্ভোগে পরিণত করেছে।

সরেজমিনে মহেশখালী ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, শত শত যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা সী-ট্রাক চালুর অপেক্ষায় রয়েছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোটে পারাপার করছেন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি রোগী, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা।

এক ক্ষুব্ধ যাত্রী বলেন, “সী-ট্রাক কি মরে গেছে? বারবার নষ্ট হওয়ার কথা শুনে আমরা ক্লান্ত। যদি নিয়মিত চালাতেই না পারেন, তাহলে মানুষের সঙ্গে এমন তামাশা কেন?”

ঘাট-সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, “বর্তমান সী-ট্রাকটি দীর্ঘমেয়াদে চলাচলের উপযোগী কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। নিয়মিত বিকল হওয়া প্রমাণ করে রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ আন্তরিক হলে এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য নতুন একটি সী-ট্রাক সংযোজন জরুরি।”

স্থানীয় বাসিন্দা মির্জা তারেক বলেন, “সী-ট্রাক কি আইসিইউতে? বারবার মেরামতের নামে বন্ধ রাখা হচ্ছে। একবার ঠিক করলে যেন দীর্ঘদিন চলতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা নিরাপদ সেবা চাই, অজুহাত নয়।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, সী-ট্রাক চালুর পর থেকেই নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, যান্ত্রিক ত্রুটির পুনরাবৃত্তি এবং বিকল্প পরিকল্পনার অভাবে পুরো নৌপথ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাদের মতে, একটি দ্বীপাঞ্চলের লাখো মানুষের একমাত্র নিরাপদ নৌযান সচল রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার না করে বিআইডব্লিউটিএর কক্সবাজার জোনের কর্মকর্তা আশরাফ বলেন, “আমরা দ্রুত সী-ট্রাক চালুর চেষ্টা করছি। স্থানীয়ভাবে মেরামত সম্ভব না হওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে টেকনিশিয়ান ও মেকানিক এনে কাজ চলছে। যত দ্রুত সম্ভব সী-ট্রাকটি জনসেবায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে।”

এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, “আমি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত মেরামত শেষে সী-ট্রাক চালুর পাশাপাশি নতুন একটি সী-ট্রাক সংযোজনের বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করব।”

দ্বীপবাসীর দাবি, মহেশখালী–কক্সবাজার নৌপথ কোনো বিলাসী পরিবহন নয়; এটি শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জীবনের একমাত্র নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা। তাই সেবা ব্যবস্থাপনায় অবহেলা বা দীর্ঘসূত্রতা নয়, স্থায়ী সমাধান এবং কার্যকর জবাবদিহিই এখন সময়ের দাবি।